ঢাকার নবাবগঞ্জের রাশিম মোল্লা। শুধু সমাজের সমস্যা তুলে এনে দায়িত্ব শেষ করেন না তিনি। পাশাপাশি তার সমাধানেও এগিয়ে যান সশরীরে। দেশের সংস্কৃতি রক্ষায় যেমন নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন তেমনি ইছামতি নদী রক্ষায়ও যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করে গড়েছেন নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি নামে একটি সামাজিক সংগঠন । গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্য রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এ ক্রীড়া সংগঠক। দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে বহু কৃষক। তাই কৃষকের জীবন রক্ষা করতে গড়ে তুলেছেন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম নামে একটি সামাজিক সংগঠন। শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এলাকাবাসীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এভাবে ক্লিন ইমেজ আর সততা ন্যায়নিষ্টা ও দেশপ্রেমে উজ্জল আলোকিত একজন মানুষ নিজেকে পরিচিত করেছেন তিনি। দোহার নবাবগঞ্জে পরিচিত পেয়েছেন একজন সফল সংগঠক হিসেবে।
জানা যায়, বাংলার লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নৌকা বাইচ প্রায় শতবছর ধরে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের ইছামতি, কালিগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীতে ঘটা করে আয়োজন হতো। তবে সেটা ভাটা পরে পানি প্রবাহের কারনে। ২০০১ সালের দিকে ঢাকার নবাবগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে কাশিয়াখালী-সোনাবাজু ইছামতী নদীর মুখে বাঁধ দেয়া হলে নদীতে পর্যাপ্ত পানি না হওয়ায় ভাটা পড়ে নৌকা বাইচের। ২০০৮-০৯ সালের দিকে পানি না হওয়ায় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এসব উপলব্ধি করে ২০১০ সালের দিকে ক্রীড়া সংগঠক রাশিম মোল্লা নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা করতে সংগঠন করার উদ্যোগ নেন। তাকে সহযোগিতা করেন এতদাঞ্চলের জনপ্রিয় নৌকা ‘মাসুদ রানা’র মালিক মাসুদ মোল্লা ও বাইচ প্রেমী দুলাল দেওয়ান। তারা ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বাইচ প্রেমীদের নিয়ে গঠন করেন নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি। গত ১৫ বছর ধরে নৌকার মালিক ও স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করে সংগঠনটি এসব অঞ্চলে আয়োজন করছে নৌকা বাইচ। এবারও সংগঠনটি ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করবেন জমজমাট নৌকা বাইচ। এরই মধ্যে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ নৌকার মালিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে বাইচ প্রস্তুতির সভা করছেন। এ বছর তারা কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে স্থানীয়দের সংগঠিত করে নৌকা বাইচ আয়োজন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা।
গ্রাম বাংলা ঐতিহ্য নৌকা বাইচ রক্ষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন রাশিম মোল্লা। তিনি উপলব্ধি করেন ইছামতিতে পানি প্রবাহ না থাকায় এবং প্রচুর কচুরিপানা নৌকা বাইচের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। সেই উপলব্ধি থেকে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাশিয়াখালী-সোনাবাজু ইছামতী নদীর মুখে স্লুইচগেট নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। নদীতে জমে থাকা কচুরিপানা অপসারনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জনসাধারণকে সচেতন করতে বিভিন্ন সভার পাশাপাশি নিজেই নেমে পড়েন কচুরীপানা অপসারনে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব পেশাজীবির মানুষদের সম্পৃক্ত করেছেন কচুরীপানা অপসারণে। ইতিমধ্যে তার আহবানে সাড়া দিয়ে ইছামতি নদীর কচুরীপানা অপসারনে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। ইছামতি নদীর এই দুর্দশা থেকে রক্ষা করতে কয়েকটি সামাজিক সংগঠন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েছে। কাজের কাজ কিছু না হওয়ায় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন অনেকেই। তবে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা। বছরব্যাপী সামাজিক নানা ইস্যুতে কাজ করছেন তিনি। ইছামতি নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা, গ্রাম বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখাই যেন তারই মূল কাজ। কখনো এলাকার স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে, আবার কখনো একাই ইছামতি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যান। ঘুরে ঘুরে বেহাল দশার চিত্র তুলে ধরেন জাতীয় গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।
নৌকা বাইচ রক্ষায় তরুন ও যুব প্লেয়ার ( মাল্লা) তৈরি করতে ২০১৭ সালে রাশিম মোল্লা গঠন করেন নবাবগঞ্জ রোইং ক্লাব। ২০২২ সালের ৩০শে মার্চ তার এই ক্লাব রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল লেকে আয়োজিত আন্তর্জাতিক নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করে। আর্ন্তজাতিক ও জাতীয় দুই ইভেন্টেই অংশ নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ক্লাবটি। কোচ হিসাবে রাশিম মোল্লা এবং ম্যানেজার হিসেবে মাসুদ মোল্লা নেতৃত্ব দেন। আন্তর্জাতিক ইভেন্টে বাংলাদেশের হয়ে তুতীয় স্থান এবং জাতীয় ইভেন্টে একই স্থান অর্জন করে।
স্থানীয় সুশীল সমাজ মনে করেন, একজন সফল সংগঠক হতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। এর সবগুলো গুণাবলিই রাশিম মোল্লা মধ্যে রয়েছে। নৌকা বাইচ রক্ষা কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক দুলাল দেওয়ান বলেন, ২০০১ সালের দিকে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় এই অঞ্চলে নৌকা বাইচ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে নবাবগঞ্জের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠক রাশিম মোল্লা নৌকা বাইচ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে মাসুদ মোল্লাকে নিয়ে একটি কমিটি করে। ওই সংগঠনের প্রচেষ্টায় এখন প্রতি বছরই ঢাকার নবাবগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নৌকা বাইচ হচ্ছে।
সংগঠনের সভাপতি মাসুদ মোল্লা বলেন, যখন নৌকা বাইচ বিলীন হওয়ার পথে তখনই হাল ধরেন তরুন ক্রীড়া সংগঠক রাশিম মোল্লা। এতে সভাপতি করা হয় আমাকে এবং রাশিম মোল্লাকে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য আহ্বান করা হয়। কিন্তু তিনি সংগঠনের ভিত্তি মজবুত করতে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। গতি আসে নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সংগঠনিক কার্যক্রমে। এলাকায় কিছুটা হলেও আগের নৌকা বাইচে উৎসবের ইমেজ ফিরে আসতে শুরু করে। রাজধানী বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন করতে বিভিন্ন লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করে কামরাঙ্গীরচরে দুবার আয়োজন করেন নৌকা বাইচ।
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আলমপুর গ্রামের জনপ্রিয় নৌকা মামা ভাগিনের মালিক আব্দুল সামাদ দেওয়ান বলেন, নৌকা বানানোর পর রাশিম মোল্লার সহযোগিতায় প্রথমেই আমি পদ্মা নদীর নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করি। বর্ষ আসলেই তিনি স্থানীয় আয়োজকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন জায়গায় সভা আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
এব্যাপারে ক্রীড়া সংগঠক রাশিম বলেন, ২০১০ সালে নৌকাবাইচ টিকিয়ে রাখতে মাসুদ মোল্লাসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে সভা করে একটি সংগঠন করার প্রস্তাব দেই। কিভাবে নৌকা বাইচের আগের সেই জৌলুশ ফিরিয়ে আনা যায়? হুট করেই একদিন গঠন করে ফেলি নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় মাসুদ মোল্লাকে এবং সদস্য সচিব করা হয় আমাকে। সদস্য করা হয় দুলাল দেওয়ান সহ আরো কয়েকজনকে। এভাবে চলতে থাকে। বছরের বহু সময় নৌকার মালিক, বাইচ প্রেমিদের খোঁজে খাঁজে সংগঠিত করি। কখনো মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে, আবার কখনো মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর ও হরিরামপুরে বাইচ প্রেমিদের সংগঠিত করতে কাজ করি।
তিনি আরো বলেন, ইছামতিতে ধারাবাহিকভাবে নৌকা বাইচের আয়োজন করতে হলে আগে ইছামতিকে রক্ষা করতে হবে। বেধিবাঁধে স্লুইচগেট নির্মাণ করে পানির প্রবাহ সচল করতে হবে। এছাড়া প্রতিবছরই ইছামতিতে কচুরীপানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই কচুরীপানা অপসারনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
মন্তব্য করুন