1. news@priyobanglanews24.com : PRIYOBANGLANEWS24 :
  2. sujitpauldhaka@gmail.com : Sujit Kumer Paul :
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

দোহার: প্রকৃতি, সমাজ ও ইতিহাসের এক মালাগাঁথা

তানিয়া লাইজু সুমি
  • আপডেট সময়ঃ বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০
  • ১৯৫৬ জন নিউজটি দেখা হয়েছে।

প্রায় তিন বছর আগে, আমার বাবা আমাকে দোহারের ইতিহাস নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা লিখতে বলেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ধরিত্রী সম্মেলন। ডকুমেন্টটি লেখার সময় বাবা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পরেন। লেখাটি নিয়ে আর এগুনো হয়নি। গতকাল অর্থাৎ, ১৫ জুলাই ছিল দোহার উপজেলার জন্মদিবস। গতকালই লেখাটি ফেসবুকে প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কাল আমি আমার অসুস্থ বাবা জনাব হায়াত আলী মিঞা এবং আমার অসুস্থ মা বেগম শেফালী হায়াতের সাথে দেখা করে কর্মস্থলে ফিরে আসছিলাম। তাই লেখাটি আর পোস্ট করা হয়নি। আমার বাবা এ লেখাটি চূড়ান্ত অবস্থায় দেখলে খুব খুশি হতেন। লেখাটি আমি বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়েছে, রেফারেন্স দেওয়া আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারো কাছে তথ্যের গ্যাপ মনে হতে পারে। এ লেখাটি কোনো ভাবেই চূড়ান্ত নয়, ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়। তথ্যের সত্যতায় কেউ যদি সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন তা ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

কেউ কপি করলে বা শেয়ার করলে আমাকে লুপে রাখলে বা জানালে খুশি হব, নিদেন পক্ষে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা আর কি!

বাবা, একদিন হয়তো দোহারের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সত্যিকারের যোগ্যতা আমার হবে। সেদিন আপনি ঠিক খুশি হবেন।

সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও অনানুষ্ঠানিক এ লেখাটি আমার বাবা জনাব হায়াত আলী মিঞাকে উৎসর্গ করলাম।

শুভ জন্মদিন দোহার!

অবতারণা

পদ্মা নদীর কোল ঘেষে সবুজ ঘোমটা পড়া প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অলঙ্কার গায়ে নাতিদীর্ঘ যে উপজেলাটি অবিরতভাবে তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে তার নামই দোহার। এত শ্রুতিমধুর নাম বোধ করি খুব কম জায়গারই আছে। “দোহার” শব্দের আভিধানিক অর্থ গায়কের সহকারী বা গায়েনের সঙ্গে ধুয়া ধরে যে। দোহারের লোকসাধারণের সাহায্যকারী মনমানসিকতা, অতিথিপরায়নতা ও জীবনচর্চা এই আভিধানিক অর্থটিকেই দ্বিতীয়বার স্মরণ করিয়ে দেয়। দোহারের নামকরণ নিয়ে দুই ধরনের কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। প্রথমত, দোহারে বাউল ও পালাগানের প্রচলন সেই অনেককাল পূর্ব থেকেই। কোনো এক বাউল ও পালা গায়ক তার দলবল নিয়ে এ অঞ্চলে আস্তানা করেছিল; গায়ক গান করতো, তাঁর সাথে দোহার দিত তাঁর সঙ্গী-সাথীরা। তারই পর থেকে এ অঞ্চলের নাম “দোহার” হিসেবে পরিচিতি পায়। তাছাড়া, বিখ্যাত পল্লী গীতি গায়ক আব্দুল আলীম এর শ্বশুরায়লয় দোহারের নিকটবর্তী বলে কথিত আছে। এখানেই জন্ম নিয়েছে বাউল শিল্পী পরশ আলী বয়াতী। দ্বিতীয় জনশ্রুতিটি এর চেয়ে একটু ভিন্ন। আগে ঢাকা বা ভিন্ন গঞ্জ থেকে দোহার এলাকায় যাতায়াত করতে হতো নৌপথে। তাও আবার সরাসরি নয়। মাঝখানে শ্রীনগর-বালাশূর অথবা ভিন্ন পথে নবাবগঞ্জে যাত্রা-বিরতি দিতে হতো। ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে দুইবার হাত বদল করতে হতো দ্রব্য-সামগ্রী। দুই হাত থেকেই নাকি দোহাত এবং এরপর দোহার শব্দের উৎপত্তি হয়েছে (জনশ্রুতি)।

উপজেলা পরিচিতি

বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা জেলার সবচেয়ে দক্ষিণে পদ্মা নদীর ঠিক পাশ ঘেষে মায়ের মতো আঁচল বিছিয়ে রেখেছে দোহার উপজেলা। ১৯২৬ সালে থানা হিসেবে দোহার এর অস্তিত্ত্বের জানান দিলেও উপজেলা হিসেবে উন্নীত হয় ১৯৮৩ সালে (বাংলাপিডিয়া)। কিন্তু দোহার উপজেলার প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে দোহার উপজেলা তৈরি হয়েছে ১৯১৭ সালের ১৫ জুলাই। একই সালের ২১ সেপ্টেম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দোহার থানা বর্তমানে দোহার উপজেলার কার্যক্রম চালু হয় (http://www.dohar.dhaka.gov.bd)। বর্তমানে দোহারে পূর্বের মতোই দোহার পৌরসভা নামে একটি পৌরসভা, ৮টি ইউনিয়ন- নয়াবাড়ি, কুসুমহাটি, রাইপাড়া, সুতারপাড়া, নারিশা, মুকসুদপুর, মাহমুদপুর ও বিলাসপুর ইউনিয়ন (http://www.dohar.dhaka.gov.bd)। মোট ৯৩টি মৌজার সমন্বয় আছে এখানে। ১৩৯টি গ্রাম একের সাথে আরেকটি মালার মতো এক সূত্রে গাঁথা আছে (একে নজরে দোহার উপজেলা)।

অবস্থান

দোহার উপজেলার অবস্থান ২৩°২৯’ এবং ২৩°৪২’ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে ও ৯০°৫৯’ এবং ৯১°০৫’ দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। উপজেলাটির উত্তরে ঘিরে আছে সহদরসম নবাবগঞ্জ, দক্ষিণ-পশ্চিম জুড়ে সুবিশাল পদ্মা, পূর্বে বন্ধুসম শ্রীনগর আর পশ্চিমে প্রতিবেশী হরিরামপুর উপজেলা; এর ছোট্ট একটি অংশ সিরাজদিখানের সাথেও যুক্ত রয়েছে। পদ্মা নদীর ঠিক পরপরই রয়েছে সদরপুর উপজেলা। অর্থাৎ, এ উপজেলার অন্তরঙ্গতা ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ (পূর্বে বিক্রমপুর), মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার সাথে। ঢাকা থেকে দোহারের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটিার।

ভূ-প্রকৃতি

নদী বিধৌত অঞ্চল দোহারের ক্ষেত্রফল ১২১.৪১ বর্গকিলোমিটার। ঢাকা জেলাকে ছয়টি ভৌগলিক অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়: মধুপুর অঞ্চল, আরিয়াল বিল, গঙ্গা বিধৌত সমতলভূমি, প্রাচীন ব্রহ্মপূত্র প্লাবনভূমি, যমুনা বিধৌত সমতলভূমি এবং মধ্য মেঘনা বিধৌত সমতলভূমি। ঢাকা জেলার গেজেট অনুযায়ী, দোহার উপজেলা আরিয়াল বিল ভৌগলিক অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত। নদী বিধৌত বলে দোহারের ভূমি পলল সমৃদ্ধ।
দোহারের মৃত্তিকা কিছুটা ক্ষারযুক্ত এবং কিছুটা অম্লযুক্ত নিরপেক্ষ প্রকৃতির। শীর্ষদেশের ভূমি শুষ্ক মৌসুমে খুব অম্লীয় থাকে এবং ভেজা মৌসুমে নিরপেক্ষ থাকে যা সেচের মাধ্যমে আমন ও বোরো চাষের জন্য উপযোগী। বর্ষা মৌসুমে এলাকার মাটি ১০ থেকে ২০ ফুট উঁচু হয়ে প্লাবিত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাঁধ দিয়ে প্লাবন রোধ করা গেলেও এখনো কিছু কিছু অঞ্চল প্রায়ই পানিবদ্ধ থাকে। মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে ভূ-প্রকৃতি খুব শুস্ক থাকে (মবিলাইজেশন রিপোর্ট ২০১৫, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর)।

জলবায়ু

নাতিশীতোষ্ণ দোহারের জলবায়ু স্বাভাবিক। ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থান এবং মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে শীত ও গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই দোহারের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। গড় তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই থাকে। তবে বিগত বছরগুলোতে শীতের সময় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গরমকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর অবস্থান করে। দোহারের পাশ ঘেষে নদী বয়ে যাওয়াতে আবহাওয়া কখনো চরম আকার ধারণ করেনা। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বনায়ন কমে যাওয়ার কারণে আবহাওয়া ও জলাবায়ুতে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও কিছুটা পরিবর্তন ও অস্বাভাবিকতা মাঝে মাঝে লক্ষ্য করা যায়। নদীর নাব্যতা সমস্যা, পানির নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে দোহারের কোনো কোনো অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

নদ-নদী, বিল-ঝিল, খাল
যে নদীর কারণে দোহারের নাম স্বর্নাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসে তার নাম পদ্মা। চিনের হোয়াংহো নদীর মতোই একদিকে পদ্মা যেমন দোহারের মানুষের পেশার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে; অপরদিকে তেমনি এই পদ্মার প্রলয়ংকরী রূপ অনেককে করেছে ঘর-বাড়ি হারা। দোহারের অনেক অধিবাসী পড়েছে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে। একসময় ইছামতি নদীর শাখা দোহারের যাতায়াত ব্যবস্থায় অনেক ভূমিকা রাখত। কিন্তু, কালের বিবর্তনে এ নদী অনেকটাই শুকিয়ে গিয়েছে। ইলশেমারি নামক আরেকটি নদী দোহারের মানুষের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। নদী ব্যতীত আরও জলাধারাও এ অঞ্চলে ভূমিকা রাখছে; যেমন- আড়িয়াল বিল ও কিছু ছোট ছোট খাল।

গাছপালা

দোহারে উল্লেখ করার মতো বড় কোনো বনভূমি নেই। তবে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ফল-ফুল ও কাঠ গাছের উপস্থিতি এ অঞ্চলের মানুষের গাছপ্রীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। বৃক্ষের মধ্যে আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, নারিকেল, সুপারী, তেঁতুল, বড়ই, পেয়ারা, কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদি রয়েছে। পূর্বের অনেক গাছই প্রায় বিলুপ্তির পথে; যেমন- হিজল, গাব, মাদার ইত্যাদি। অনেক নতুন গাছ আবার জায়গা করে নিয়েছে নতুনভাবে; যেমন- মেহগনি, নীম, দেবদারু, শিশু ইত্যাদি। গুল্ম জাতীয় ছোট গাছের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ফুলের গাছ; যেমন- গোলাপ, জবা, টগরসহ আরো নানান রকম সৌখিন গাছ। বর্তমানের প্রাকৃতিক দূর্যোগের কথা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে দোহারে বনায়নের প্রতি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কৃষি ও ফসলাদি

দোহার উপজেলায় ৩৯, ১০৩ হেক্টর চাষযোগ্য জমি রয়েছে; এর মধ্যে নেট কৃষি জমি ১৬, ৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে ৩০১৫ হেক্টর জমি এক ফসলী, ৪৩৬৭ হেক্টর জমি দোফসলী, ৯১১৮ হেক্টর জমি তেফসলী। কৃষি কাজে সুবিধার জন্য সেচ সুবিধা রয়েছে, রয়েছে ১২৩টি গভীর নলকূপ, ২৪৩৪টি শ্যালো নলকূপ এবং ২৮৮টি লিফট পাম্প। হাত নলকূপের সংখ্যা ৪২৭৬টি।
উপজেলাটিতে ৭৮, ২৬৭ মেট্রিক টন বার্ষিক খাদ্য চাহিদা রয়েছে। প্রধান খাদ্য শস্যের মধ্যে উৎপাদিত হয় বোরো ধান, আমন ধান, আলু, ডাল, সরিষা এবং অর্থকরী শস্যের মধ্যে পাট, তামাক ইত্যাদি। ফলের মধ্যে হয় আম, নারিকেল, পেয়ারা, পেঁপে, কাঁঠাল, কলা এবং কিছু লিচু। এছাড়া এ অঞ্চলে সবজিও উৎপাদিত হয়ে থাকে (Inception report on preparation of development plan for fourteen upazilas, 2011)।

মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ

মাছের অঞ্চল দোহার। এ অঞ্চলে বাজারগুলো একদিকে যেমন রূপালী ইলিশের আলোয় আলোকিত থাাকে তেমনি থাকে ছোট-বড় নানান রকম মাছের উপস্থিতি। খাদ্য প্রিয় দোহারের মানুষ বাজারে গিয়ে সবচেয়ে বড় মাছটির দিকেই আঙুল তুলে দেয়; আর মাছগুলোও যেন তেমন, এ বলে দেখনা আমায়, ও বলে আমায় দেখ! এখানে অনেক মাছের খামার রয়েছে যেখান থেকে বিভিন্ন রকম হাইব্রীড মাছ, কার্প জাতীয় মাছ উৎপাদিত হয় যা এলাকার মানুষের মাছের চাহিদা অনেকটা পূরণ করে থাকে। দোহার উপজেলায় ৭৪৫৪ টি মাছ চাষের পুকুর এবং ৭টি (১টি সরকারী ও ৬টি বেসরকারী) মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র বা মৎস্য বীজ উৎপাদনকারী খামার রয়েছে। বার্ষিক মৎস্য চাহিদা ৬১৮০ মেট্রিক টন যার মধ্যে ৫৫১৩ মেট্রিক টন স্থানীয়ভাবে পূরণ হয়ে থাকে। এখানে ১২২টি হাইব্রীড খামার, ১৫০টি মুরগীর খামার এবং ৪টি বানিজ্যিক মাছের খামার রয়েছে। রয়েছে ৩২৩টি বিভিন্ন রকমের সমবায় প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে ১২০টি কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠান (Dohar upazila at a glance)।

গাছপালার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করেই এ অঞ্চলের জীবজন্তু দৃশ্যমান। জীবজন্তুর বৈচিত্র্য তেমন চোখে পড়েনা। কোনো সুনির্দিষ্ট বনভূমি না থাকায় হিং¯্র বন্য প্রাণী তেমন নেই। তবে গৃহপালিত প্রাণী রয়েছে প্রচুর। জলাভূমি থাকায় জলজ প্রাণী দেখা যায়। বন্য প্রাণীর মধ্যে পূর্বে বাঘডাসা, শেয়াল, খাটাসের নাম উল্লেখ করা যায়। হিং¯্র প্রাণীর মধ্যে জলাভূমির গুঁই সাপ সহ অন্যান্য সাপের নাম উল্লেখ করা যায়। গৃহপালিত পশুর মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগীসহ আরও কিছু প্রাণী। পূর্বের ঘোড়ার একটি যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হরেও এখন তা বিলুপ্তির পথে। তবে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হলো পাখি। শীতের সময় দোহারে প্রচুর অতিথি পাখি দেখা যায় চর অঞ্চল, নদীর তীর ও বিল এলাকায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ পাখি বেশ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
দোহার উপজেলায় একটি পশু চিকিৎসা কেন্দ্র আছে যেখানে দুই জন পশু ডাক্তার কর্মরত আছেন। কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের সংখ্যা ১টি ও পয়েন্টের সংখ্যা ৩টি। উন্নত মুরগির খামারের সংখ্যা ১১টি; ব্রয়লার মুরগির খামার ৯৬টি; তবে উন্নয়নযোগ্য ও ছোট পরিধির খামারের সংখ্যা অগনীত। গবাদী পশুর খামার ২২টি ((http://www.dohar.dhaka.gov.bd)। এসব খামার এলাকার ডিম, দুধ ও মাংস চাহিদা পূরণ করে থাকে।

গ্রাম

দোহারের ৮টি ইউনিয়নে রয়েছে ১০৯টি গ্রাম। নয়াবাড়ি ইউনিয়েনে রয়েছে ১০টি গ্রাম (অরঙ্গাবাদ, কদমতলী, পানকু-, হাতনী, চর হাতনী, পশ্চিম ধোয়াইর, মধ্য ধোয়াইর, পূর্ব ধোয়াইর, বাহ্রা ও আন্তা); কুসুমহাটি ইউনিয়েনে রয়েছে ১১টি গ্রাম (শিলাকোঠা, সুন্দরিপাড়া, কার্তিকপুর, বাস্তা, চরকুশাই, বাবুডাঙ্গী, মাহতাবনগর, আরিতা, আওলিয়াবাদ, ইমান নগর, পুষ্পখালি, আংশিক করিমগঞ্জ); রাইপাড়া ইউনিয়েনে রয়েছে ১১টি গ্রাম (ইকরাশি, পালামগঞ্জ, রাইপাড়া, লক্ষ্মীপ্রসাদ, ইসলামপুর, জামালচর, নাগেরকান্দা, লটাখোলা, সড়কপাড়, বৌবাজার, আংশিক করিমগঞ্জ); জয়পাড়া ইউনিয়েনে রয়েছে ১৮টি গ্রাম (দক্ষিণ জয়পাড়া, উত্তর জয়পাড়া, খারাকান্দা, কাটাখালি, ঘোনা, নূরপুর, বটিয়া, লটাখোলা, চর জয়পাড়া, ব্যাঙারচক, কুঠিরপাড়, আঙিনা, রসুলপুর, গাজীকান্দা, ইউসুফপুর, মাঝিবাড়ি, কুঠিবাড়ি, লস্করকান্দা); সুতারপাড়া ইউনিয়েনে রয়েছে ১৪টি গ্রাম (দোহার, বানাঘাটা, নিকড়া, সোনার বাংলা, কাজিরচর, মধুরচর, সুতারপাড়া, মিজান নগর, মারুয়াপোতা, গাজীরটেক, ডাইয়া গজারিয়া, ডাইয়ারকুম, ঘারমোড়া, মুন্সীকান্দা); নারিশা ইউনিয়েনে রয়েছে ১২টি গ্রাম (সাতভিটা, চৈতাবাতর পূর্বচর, পশ্চিমচর, নারিশার যোয়ার, মেঘুলা, রানিপুর, উত্তর শিমুলিয়া, দক্ষিণ শিমুলিয়া, মালিকান্দা, ঝনকি, তালপট্টি); বিলাশপুর ইউনিয়েনে রয়েছে ০৫টি গ্রাম (কৃষ্ণদেবপুর, কুলচুরি, বিলাশপুর. রাধানগর, রামনাথপুর); মাহমুদপুর ইউনিয়েনে রয়েছে ০৭টি গ্রাম (চরকুশাইর চর, চর বৈতা, শ্রীকৃষ্ণপুর, মাহমুদপুর, চর কুসুমহাটি, লাটাখোলা, হরিচ-ী); মুকসুদপুর ইউনিয়েনে রয়েছে ১৭টি গ্রাম (বানিয়া বাড়ি, শাইনপুকুর, ঢালারপাড়, বেথূয়া, শান্তিনগর, খড়িয়া খালপাড়, গোড়াবন, মহামানিকা, মুকসুদপুর, পূর্বচর, মধুরখোলা, দক্ষিণ মধুরখোলা, রুইথা, মইতপাড়া, মৌড়া, ধীৎপুর, ছত্রভোগ)।

ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়

বিভিন্ন বয়স, পেশা, ধর্ম, লিঙ্গ ও সক্ষমতার মানুষের বসবাস এ উপজেলাকে করে তুলেছে বৈচিত্র্যময়। একসময় কৃষি প্রধান হলেও এ অঞ্চলের অনেক অধিবাসী বহির্বিশ্বে অবস্থান করে এবং তাদের আয়কৃত অর্থের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জেলে, ব্যবসায়ী, চাকরীজীবীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। অর্থনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। দোহারে তাঁত বিশেষ করে লুঙ্গি শিল্প দেশে ও বিদেশে বিশেষ কদর পেয়েছে।

দোহারে উল্লেখযোগ্য চারটি ধর্মের লোকেরই বসবাস রয়েছে যদিও ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখানে ৪১২টি মসজিদ ও ৬০টি মন্দির (এক নজরে দোহার উপজেলা)। এখানে কেনো গীর্জা না থাকলেও এ অঞ্চলের খ্রীষ্টান সম্প্রদায় পার্শ্ববর্তী এলাকার গীর্জায় ধর্মীয় আচার পালন করে। এছাড়া ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে এখানে কিছু লোক মাজার সং¯কৃতিতে বিশ্বাস করে যারা অঞ্চলের ৪টি মাজারে যাতায়াত করে। যে ধর্ম বা যে বিশ্বাস বা যে নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যই হোন না কেন, দোহারের মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য আতিথেয়তা। আর এ আতিথেয়তার জন্যই এ উপজেলাটি অন্য অনেক উপজেলার চেয়ে অনেক পৃথক।

জনসংখ্যা

প্রকৃতি, মাটি, আকাশ আর মানুষ নিয়েই দোহার। জনবহুল দোহারের নামটি থেকেই বোঝা যায় কত অন্তরঙ্গতার সাথে এখানে বসবাস করছে মানুষ একের সাথে আরেক কাঁধ মিলিয়ে। ৪৯,৪০০ টি পরিবারে বসবাসরত প্রায় ২,২৬,৪৩৯ জনসংখ্যার মধ্যে ১,১৯,৩৯৮ জন নারী। সংখ্যাগত দিক থেকে নারী-পুরুষের সমতা আসলেই উল্লেখযোগ্য। নাগরিক সুবিধা ভোগের দিক থেকেও সমতা দৃশ্যমান- পুরুষ নারী ভোটারের সংখ্যা যথাক্রমে ৭৩,১২০ ও ৭৮,৬৫০ জন। সুন্দর পরিবেশ ও বসবাসযাগ্য বলেই হয়তো লোকসংখ্যার ঘনত্ব একটু বেশি, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৪০২ জন (http://www.dohar.dhaka.gov.bd)।

শিক্ষা

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দোহার অনেক এগিয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। কথিত আছে দোহারেই বাংলাদেশের প্রথম নাটক মঞ্চন্থ হয়। দোহারে পারিবারিক পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় পর্যস্ত সংস্কৃতি চর্চার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সংস্কৃতিতে এগিয়ে থাকলেও শিক্ষাক্ষেত্রে দোহারে এখনো যেতে হবে অনেক দূর। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু মানুষের উত্থান দোহার থেকে হলেও সরকারি হিসেব মতে, দোহারে সাক্ষরতার হার ৬৫% যেখানে পুরুষ ৬৮% এবং নারী ৬২%। উল্লেখ্য দোহারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১২০টি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৮টি, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০টি, জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয় ৬টি, উচ্চ বিদ্যালয় (সহশিক্ষা) ৪১টি, উচ্চ বিদ্যালয় (বালিকা) ০৩টি, দাখিল মাদ্রাসা ১৬টি, আলিম মাদ্রাসা ০৭টি, ফাজিল মাদ্রাসা ০৪টি, কামিল মাদ্রাসা ০২টি, কলেজ (সহপাঠ) ০৯টি, কলেজ (বালিকা) ০১টি। (তথ্য: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন)। এছাড়াও রয়েছে ৩টি কওমী মাদ্রাসা এবং ১৮টি কিন্ডার গার্টেন। রয়েছে ১টি কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ (http://www.dohar.dhaka.gov.bd)। এই উপজেলার প্রতি ৪২৮৩ জনের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেখানে জাতীয় পর্যায়ে প্রতি ১৩৮০ জনের জন্য রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিচেনায় এখনো অনেক মূলধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রতিটি গ্রামে অন্ততঃ একটি এবং বৃহৎ গ্রামে একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থাপন শিক্ষাক্ষেত্রে সমতা আনয়ন করতে পারে বলে আশা করা যায়। এখানে রয়েছে ১৭টি এতিমখানা যা শিক্ষাক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে অবদান রাখতে পারে (Inception report on preparation of development plan for fourteen upazilas, 2011)। দোহারে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য যাদের নাম না বললেই নয় তারা হলেন আলহাজ¦ মেহাম্মদ আছালত মিয়া, আশরাফ আলী চৌধুরী, এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান, আলেফ সরদার, মগদুম মাদবর, গনি শিকদার গং, ডাঃ আবুল কালাম, ডাঃ লোকমান হোসেন, জহির উদ্দীন আহমেদ, হাজী মোহাম্মদ আব্দুল মোন্নাফ, জনাব বজলুর রহমান ভূইয়া, জনাব মৈজ উদ্দীন মোল্লা, একলাল উদ্দীন আহমেদ, হায়াত আলী মিঞা, আনিস মিঞা, আব্দুস সাত্তার, মাওলানা আরশেদ আলী প্রমুখ।

সংস্কৃতি, পর্ব ও আচার-আচরণ

সাংস্কৃতিকভাবে দোহার অনেক আগে থেকেই খুব সমৃদ্ধ। দোহারের নামকরণ থেকেও বোঝা যায় এখানে পল্লী, বাউল এবং কবিয়াল গানের প্রচলন ও চর্চা রয়েছে। দোহারেই জন্ম নিয়েছেন সঙ্গীতকার হাসান মতিউর রহমান। কথিত আছে, এখানেই প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত সবাই পূর্বে উৎসাহের সাথে নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা নিতেনও অংশগ্রহণ করতেন। এছাড়া যাত্রা ও পালাগানেরও চর্চা এ অঞ্চলে দৃশ্যমান। পূর্বে আমিন লস্কর নামক জনৈক সংস্কৃতি মননসম্পন্ন ব্যক্তি পালাগানের কর্মশালা ও চর্চার আয়োজন করতেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গায়কগণ তাদের দলসহ এখানে অংশগ্রহণ করতেন। সরকারীভাবে দোহারে একটি শিল্পকলা একাডেমী রয়েছে যেখানে শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতি চর্চা করার সুযোগ তৈরি করা হয়।

দোহারে রয়েছে একটি পাবলিক লাইব্রেরী; যদিও লাইব্রেরীটি ততটা চলমান নয়। এছাড়া বিশ^-সাহিত্য কেন্দ্রের মোবাইল লাইব্রেরী মাসের একদিন দোহারে অবস্থান করে। রয়েছে একটি অনলাইন পাবলিক লাইব্রেরী, এটা আনুষ্ঠানিক কোনো আকৃতি না পেলেও পড়–য়া জনগোষ্ঠী তৈরির জন্য এটি একটি ইতিবাচক চেষ্টা বলে মনে করা যেতে পারে।
দোহারের মানুষ খুব আমোদপ্রিয় এবং অতিথিপরায়ন। বিভিন্ন পালা-পার্বণ এখানে খুব ধুমধামের সাথে পালিত হয়ে থাকে। পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য বৈশাখ মাসে পুরো মাসব্যপী মেলা হয়। বৈশাখী মেলা ছাড়াও হয় আরও অনেক রকমের মেলা। স্বাধীনতা মেলা, বিজয় মেলায় হয় নানা রকমের কুজকাওয়াজ ও প্রদর্শনী। এছাড়া কয়েক মাস ব্যপী হয় বিভিন্ন রকমের মেলা; যেমন- শাহ স্যানাল ফকির (নুরুল্লাপুর) এর মেলা, পরান শাহ ফকির (বাস্তা) মেলা, নাগর চৌধুরী মেলা, কাটাখালি মেলাসহ আরও ছোট ছোট অনেক রকমের মেলা।
বিভিন্ন রকমের পর্ব ও অনুষ্ঠানে দোহারে পিঠার খুব প্রচলন। এখানে ভাপা, পুলি, চিতই, রসের পিঠাসহ নানান রকম পিঠার প্রচলন আছে। গৃহ-রন্ধন শিল্পে দোহার একটি বিশেষ রকমেরই বটে। মাছের এলাকা দোহারের মানুষ একটু ভোজন-রসিক। এখানে নানান রকমের খাদ্য-প্রনালী প্রচলিত যাতে নারিকেল, মেথি, সরিষাসহ নানান রকমের উপাদান ব্যবহৃত হয় যা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটা পৃথক। কুড়ি বাড়ির অতি ঝাল চানাচুর দোহারে বাইরের মানুষের কাছেও অনেক প্রিয়। দোহারের মিষ্টি দোহারের মানুষের মতোই অনেক সুপ্রিয়।

সামাজিক অনুষ্ঠানের বাইরেও দোহারে অনেক রকম পারিবারিক পর্যায়ের অনুষ্ঠান খুব ধুমধামের সাথে পালিত হয়। বিয়ে, জন্মদিন, মৃত ব্যক্তির নামে অনুষ্ঠান এমনকি সুন্নতে খাতনা অনুষ্ঠানও পালিত হয় খুব আনুষ্ঠানিকতার সাথে। এসব অনুষ্ঠানে দোহারের মানুষ একের সাথে অন্যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে।

দোহারে নদী-নালা, খাল-বিল থাকার কারণে এখানে নৌকা বাইচ হয়। নৌকা বাইচে দোহারসহ দোহারের আশেপাশের এলাকা অংশগ্রহণ করে। পূর্বে গরু দৌড় প্রতিযোগীতা হয় যা এখন বিলুপ্তির পথে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

দোহারে সাম্প্রতিককালে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধার ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। এখানে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে ১টি, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ১৬টি। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক রযেছে ১৩টি। মঞ্জুরীকৃত মেডিকেল অফিসারের সংখ্যা ৩৭টি যেখানে কর্মরত ডাক্তারের সংখ্যা ৩৪ জন (ইউএইচসি ১৭, ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৬, ইউইচএফপিও ১ জন)। এছাড়া রয়েছে ১৫ জন নার্স ও ১ জন সহকারি নার্স (http://www.dohar.dhaka.gov.bd)। বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে ১০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদিও গুণগত মানের দিক থেকে অনেক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে এখনো। জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেল্থ নিয়েও কাজ করার আছে অনেক। দোহারে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুবাদে সবার স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে ধারণা করা যায় ।

যাতায়াত ব্যবস্থা ও বহিঃযোগাযোগ

দোহার উপজেলার অভ্যন্তরে ১৪৭ কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে। এছাড়া ৪৮ কিলোমিটার আধাপাকা, ২০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে (বাংলাপিডিয়া ২০১৫)। ৪৬৬টি সেতু ও কালভার্ট সুবিধা রয়েছে এ অঞ্চলে। এখানে একটি বন্যা প্রতিরোধক একটি বাঁধ রয়েছে যা রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীনভাবে যোগাযোগের জন্য সাইকেল, মোটর সাইকেল, মোটর গাড়ি, রিকশা, অটোরিকশা, বাস, টেম্পু ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ঢাকা থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী এ ছোট উপজেলাটির অধিবাসীগণ নিকটবর্তী শহরের সাথে সড়কপথেই যাতায়াত করে থাকে। বিভিন্ন বেসরকারী পর্যায়ের বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। পূর্বে জলপথই প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু গত প্রায় দুই দশক ধরে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

যোগাযোগের জন্য দোহারে ডাক অফিস ও টেলিফোন রয়েছে। তবে টেলিযোগাযোগের এ উন্নয়নমুখী সময়ে প্রায় সবার হাতে হাতেই মোবাইল ফোন রয়েছে যা দেশে-বিদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

রাজনীতি

রাজনীতেতে দোহার বরাবরই সরগরম। এখান থেকে উঠে এসেছে জাতীয় পর্যায়ের অনেক রাজনীতিবীদ ও কলাকুশলী। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের বহুমুখী রাজনীতি, সবক্ষেত্রেই এলাকার জনগণের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রয়েছে। অবিভক্ত বাংলার নেতৃত্বে যেমন এ অঞ্চলের সূর্য সন্তানদের অংশগ্রহণ নজর কাড়ে, তেমনি স্বাধীন বাংলার নেতৃত্বেও অঞ্চলের সন্তানেরা পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য এডভোকেট রফি উদ্দীন আহমেদ, দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ক্যাপ্টেন নূরুল হক, তৃতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য শহীদ আহমেদ খন্দকার, চতুর্থ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য শহীদ আহমেদ খন্দকার, পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, অষ্টম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান, দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য এডভোকেট সালমা ইসলাম এবং একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য সালমান ফজলুর রহমান। প্রত্যেক সংসদ সদস্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

অর্থনীতি

দোহারের অর্থনীতি মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; কৃষি, তাঁত শিল্প এবং বিদেশী রেমিট্যান্স। কৃষিখাত থেকে ৫২.৬৪% আয় হয় (Dhaka districts statistics, population census report, 2011)। কলকারখানায় কর্মরত অধিবাসীর সংখ্যা ১১.০৪% এবং চাকরীতে নিযুক্ত আছে ৩৬.৩২% (Inception report on preparation of development plan for fourteen upazilas, 2011)। স্থানীয় কল-কারখানার মধ্যে রয়েছে সুতার কল, করাত কল, ওয়েলডিং কারখানা, ধান-গম ভাঙাইয়ের কল ইত্যাদি। এখানে ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে রয়েছে কামার, কুমার, তাঁত ইত্যাদি। এখানে ৭৮১ ধরনের কুটিরশিল্প এবং তিনটি মধ্যম মাত্রার ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট রয়েছে।

দোহারের আয়ের একটি প্রধান উৎস বৈদেশিক মুদ্রা। এখানকার জনবসতীর অনেকে বিদেশে বিভিন্ন কাজে কর্মরত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলত শ্রমিক হিসেবে দোহারের জনগোষ্ঠী কাজে নিয়োজিত আছে। এ জনগোষ্ঠী শুধু দোহারের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে তা নয়; বরং দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন

এখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করছে অনেকে। সামাজিক সংগঠন এর মধ্যে আছে স্কলারস ইউনিয়ন অব দোহার (সাড), দোহার ব্লাড ব্যাংক, এসএমএমএস- ৯২, সেই (এসএসওয়াই) টুগেদার।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে দোহার যুবক সমিতি, লটাখোলা চাঁদতারা ক্লাব, কাটাখালি ক্লাব, ইকরাশি নবীন সংঘ, থিয়েটার গ্রুপ ১, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী, সংগীত একডেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন। এছাড়াও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানের সাথে বিভিন্ন স্কাউটস, কাব ও হলদে পাখির দল রয়েছে যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করে থাকে।

দর্শনীয় স্থান

ঢাকার অদূরে অবস্থিত দোহারের পদ্মার পাড় দিয়ে হেঁটে গেলে অনেকেরই ভ্রম হতে পারে এই ভেবে যে, বুঝি সমুদ্র সৈকতে চলে এলাম। মিনি কক্সবাজার খ্যাত মৈনট এখন দোহারের গর্ব করার মতো দর্শনীয় স্থান; রয়েছে মিনি পতেঙ্গা খ্যাত বাহ্রা, কোঠাবাড়ি বিল, নারিশা পদ্মার পাড়, আরিয়াল বিল, মুকসুদপুুরের ডাক বাংলো, দুবলী টু নবাবগঞ্জ রোড, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, বাবু বাড়ির পুকুর, সাইনপুকুর বড়বাড়ি, বিভিন্ন মেলা। এছাড়া বিভিন্ন গ্রামের ভেতর দিয়ে সবুজ বনানী, হলুদ শরষে ক্ষেত, ধানী ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা আইল, মাঠের পাশের মেঠো পথ… সবই নাগরিক মানুষকে আহ্বান জানায়। পরিদর্শকরা এখানে বেড়াতে এসে পিঠা আর মিষ্টির মজায় বুদ হয়ে যায়। ভুলে যায় নাগরিক কোলাহলের কৃত্রিমতা।

দোকান, বাজার, ব্যাংক

যেকোনো এলাকার মানব প্রকৃতির অনেকটাই ধরা পড়ে হাট বাজারের মাধ্যমে। দোহারে রয়েছে ৩২টি হাট। এ হাটগুলো সারা সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকায় তাদের পসরা সাজিয়ে বসে। কী পাওয়া যায় না সেখানে! কেনাকাটার জন্য হাট-বাজারের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং মল। আছে দেশের নামকরা ব্র্যান্ড এর আউটলেট, আছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, আছে মল। কর্পোরেট জগতের সাথে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠছে ব্যাংক বীমা। ৮টি ইউনিয়ের দোহারে ব্যাংক আছে ২৫টি। এ যেন এলাকার লেনদেন ও অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র প্রকাশ করে।

বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব

অবস্থানের দিক থেকে ঢাকার সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা এবং ক্ষেত্রফলের দিক থেকে ঢাকার সবচেয়ে ছোট উপজেলা দোহার। কিন্তু ভৌগলিক অবস্থান, দূরত্ব বা আকার দোহারের কৃতি সন্তানদের আটকে রাখতে পারেনি, আটকাতে পারেনি তাদের মেধার বিকাশ ও অবদানের গ-ী। শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক খান বাহাদুর আব্দুল লতিফ, খান বাহাদুর আব্দুল খালেক, প্রাক্তন গভর্নর আশরাফ আলী চৌধুরী ওরফে মধু মিঞা, গোলাম সফি উদ্দীন চৌধুরী ওরফে আতা মিঞা। এ উপজেলারই কৃতি সন্তান রিয়ার এডমিরাল এম এস খান এক সময় বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। বাংলাদেশের কয়েকজন চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করলে দোহারের সন্তান ব্রিগেডিয়ার ডঃ এ আর খানের নাম উল্লেখ করতে হয়।

রাজনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি কোনো ক্ষেত্রেই দেশে-বিদেশে দোহারের সূর্য সন্তানেরা পিছিয়ে নেই। এখানেই জন্ম নিয়েছেনে বর্তমানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রাক্তন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মান্নান খান, প্রাক্তন যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, অবিভক্ত বাংলার খাদ্য মন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার ঘোষ, অবিভক্ত বাংলার প্রিভি কাউন্সিলর নাগর চৌধুরী এবং প্রিভি কাউন্সিল সদস্য ফজলুর রহমান যিনি ১৯৫২ সালে শিক্ষা মন্ত্রী ও ১৯৫৪ সালে খাদ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে জন্মেছেন স্পেস বিজ্ঞানী মুকুল দেওয়ান ও প্রফেসর কবিরুল বাশার। ক্যাপ্টেন জি এম মনিরউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন নূরুল হক, ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ, স্টেট ব্যাংক অব্ পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর রাফিদ চৌধুরী, বাংলাদেশ পুলিশ এর প্রাক্তন আইজিপি মহিউদ্দীন আহমেদ, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত হাফিজ উদ্দীন আহমেদ, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার শামসুদ্দীন আহমেদসহ আরও অনেকে। এখানেই জন্ম বিচারপতি কে এম ফজলুর রহমান, কর্নেল ফজলুর রহমান শরীফ, জমিদার আব্দুল হামিদ, প্রাণী বিজ্ঞানী আশরাফ আলী ও আসমত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের। প্রখ্যাত শিল্পপতি বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান দোহারকে প্রতিষ্ঠা করেছেন আন্তর্জাতিকভাবে। দেশে-বিদেশের খেলার মাঠে শামীম আশরাফ চৌধুরীর ধারাভাষ্য আমাদের উদ্দীপ্ত করে। এখানেই জন্ম নিয়েছেন কবি তসর আলী, কবি সালাউদ্দীন আহমেদ এর মতো গুনীজন। নারীদের মধ্যে ডাঃ শায়লা আহমেদ, ডাঃ নাসরীন পারভীন, মাহবুবা আহমেদ বেলী, প্রফেসর হালিমা খাতুনের নাম উল্লেখ করা যায়। এছাড়াও সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, প্রশাসনসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দোহারের গুনী সন্তানগণ মাথা উঁচু করে তাদের তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

উপজেলার গৌরব গাঁথার পাদটীকা

দোহারের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই বৃটিশ শাসনামল থেকে শুরু করেই এ অঞ্চল জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে। অনেকে শুনলে অবাক হবেন যে, দোহারের জয়পাড়া গ্রামে একসময় নীল চাষ হতো। এখানে অসহযোগ আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠে অভয়াশ্রম। ১৯৪০ সালে মহাত্মা গান্ধী দোহার পরিদর্শন করেন ও সেবাসঙ্ঘের সর্বভারতীয় সম্মেলনে যোগ দেন (Banglapedia, recited in https://wikivividly.com)। মহাত্মা গান্ধীর নামানুসারেই এ আশ্রমের নামকরণ করা হয় গান্ধী আশ্রম। এ আশ্রম এখনো তার অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে সেই ইতিহাসের। মালিকান্দায় অবস্থিত জিন্নাহ আশ্রম আমাদের এলাকার সংগ্রামের কথাও কিছুটা স্মরণ করিয়ে দেয় বৈকি!

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যা গত বছর “বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য” হিসেবে “মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে” যুক্ত করেছে ইউনেস্কো, সেই ভাষণের ভিডিও কপি প্রথম পর্যায়ে সংরক্ষিত ছিল দোহারে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানেরর ভাষণ ধারণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সময়ে চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক মহিবুর রহমান খানের (অভিনেতা আবুল খায়ের নামেই বেশি পরিচিত) নির্দেশে আমজাদ আলী খন্দকারসহ সহযোগীগণ ভাষণের ভিডিও ধারণ ও সংরক্ষণের কাজ করেন। পাকিস্তানি হায়েনাদের থাবা থেকে রক্ষা করার জন্য এই অমূল্য সম্পদসম ভিডিও টেপটি ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল প্রথমত দোহারস্থ জয়পাড়া গ্রামের মজিদ দারোগার বাড়িতে রাখা হয়। পরবর্তীতে অধিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই টেপটি কুসুমহাটি ইউনিয়নের চরকুসাই নামক গ্রামের হাজি দানেশ ও উমেদ খাঁ নামক দুই ভাইয়ের বাড়িতে ধানের গোলার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। সেখানে ধানের গোলাতে মাসখানেক রাখার পর নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। নয় মাসের যুদ্ধ জয়ের পর ভিডিও টেপটিও ফিরে আসে নতুন বাংলাদেশে। এভাবে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ সংরক্ষণে দোহারের নাম স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে হাজার হাজার বছর ধরে। উল্লেখ্য সাদাকালো ভিডিওটি ১৯১৬ সালে রঙিন সংস্করণে রূপান্তর করা হয় (bdnews 24)।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১১টি সেক্টরের মধ্যে ২নং সেক্টরের আওতাভুক্ত ছিল ঢাকা জেলা। ঢাকা জেলার একটি উপজেলা হিসেবে দোহার ও এর পাশর্^বর্তী এলাকাসমূহ ২নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে মেজর খালেদ মোশারফ এবং পরবর্তীতে মেজর এটিএম হায়দার সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। ২নং সেক্টরের সাবসেক্টর নাগেরকান্দার সাবসেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ক্যাপ্টেন সৈয়দ আব্দুল হালিম চৌধুরী (List of sectors in the Bangladesh Liberation War – Wikipedia)। দোহারের জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধে সাহসীকতার সাথে ঝাপিয়ে পড়ে। আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার যুদ্ধে দোহারে থানা কমান্ডার হিসেবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন সিরাজউদ্দীন আহমদ এবং ডঃ আবুল কালাম; আর অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন সাইদুর রহমান। দোহারের পাশর্^বর্তী উপজেলা হরিরামপুর থানায় স্বাধানতা যুদ্ধের থানা কমান্ডার হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন দোহারের কৃতি সন্তান হায়াত আলী মিঞা। দোহারে তালিকাভূক্ত ৫৬৭ জন মুক্তিযাদ্ধার হিসেব পাওয়া যায়। তবে এর বাইরেও বাংলাদেশের হাজারো মা-বোন-বাবা-ভাইদের মতো মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন দোহারের মা-বোন-বাবা-ভাই। অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে আত্মীয় পরিজন হারিয়েছেন, অনেক গৃহহীন হয়েছেন। তারপরও ভেঙে পরেননি।

বীর উত্তম খেতাব প্রাপ্ত দোহারের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালেক চৌধুরী। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করে। তার গেজেট নম্বর ১৯। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মেজর পদাধারী ছিলেন। আবদুস সালেক চৌধুরী’র পৈতৃক বাড়ি ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার হাতুরপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আবদুল রহিম চৌধুরী এবং মায়ের নাম সায়মা খানম। ১৯৭১ সালে আবদুস সালেক চৌধুরী কর্মরত ছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে। প্রাথমিক পর্যায়ে খালেদ মোশাররফের (বীর উত্তম) অধীনে কুমিল্লা অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। পরে সেক্টর গঠিত হলে দুই নম্বর সেক্টরের সালদা নদী সাবসেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। সেপ্টেম্বর মাসে ভয়াবহ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের নেতৃত্ব দেন আবদুস সালেক চৌধুরী। মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলেও সালেক চৌধুরী সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। শত্রুর বিপক্ষে সরাসরি আক্রমণেও তিনি অংশগ্রহণ করেন (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ২, আমাদের সংগ্রাম চলবেই, অপরাজেয় সংঘ)।

পরিশেষ

ভালো-মন্দের চিত্রে চিত্রায়িত দোহার একদিকে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখে মাথা উঁচু করেছে; অপরদিকে বিভিন্ন সময় কৃত্রিম বৈষম্য তৈরি করে নিন্দিত হয়েছে ও পিছিয়ে পড়েছে। ইচ্ছে করলেই আমরা পারি আমাদের দোহারকে বাংলাদেশের আদর্শ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে; প্রয়োজন একতা, নিষ্ঠা এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। তখন হয়তো দূর দূরান্ত থেকে দোহার দর্শনে আসবে পর্যটকগণ, লিখবেন গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা বা প্রবন্ধ।
ঢাকার মাত্র দেড় ঘণ্টা দূরের দোহারকে নিয়ে তখন ঢাকা গর্ব করবে, দেবে দৃষ্টান্ত।

এই নিউজটি সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ
কপিরাইট © ২০১৯-২০২০
পিবি লিংক এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান